নয়াদিল্লি: নাবালিকার যৌন নিগ্রহ মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল দিল্লি হাইকোর্ট। আদালত জানিয়ে দিল, সওয়াল জবাবের সময় পোশাক পরিচ্ছদের নিরিখে কোনও মেয়ের চরিত্র নির্ধারণ যাবে না। পোশাক পরিচ্ছদকে সামনে রেখে দোষ চাপানো যাবে না কোনও মেয়ের ঘাড়ে। ট্রায়াল কোর্টের রায় খারিজ করে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করল আদালত। (POCO Case)
২০১৩ সালের একটি ঘটনাকে ঘিরে যে মামলা দায়ের হয়েছিল, তা নিয়েই এমন মন্তব্য করল আদালত। ১৭ বছর বয়সি একটি মেয়ের উদ্দেশে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা হয়। মেয়েটির গাল এবং পশ্চাদভাগ স্পর্শ করে অভিযুক্ত। ওই ঘটনায় ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫এ ধারায় যৌন হেনস্থা এবং POCSO আইনের ১০ নং ধারায় মামলা দায়ের হয়েছিল। (Delhi High Court)
আরও পড়ুন: আজীবন ধূমপান সত্ত্বেও ক্যান্সার মুক্ত থাকেন অনেকে, কী করে এমনটা ঘটে?
ট্রায়াল কোর্টে শুনানি চলাকালীন ২০১৪ সালে ওই মামলায় ছাড়া পেয়ে যায় অভিযুক্ত। ট্রায়াল কোর্টে সে দাবি করে,এলাকার রক্ষণশীল বাসিন্দারা মেয়েটির পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি তুলছিলেন। এমনকি থানায় অভিযোগও জানানো হয়েছিল সেই নিয়ে। অভিযোগপত্রে সই করেছিল সে নিজেও। কিন্তু এক সাব ইনস্পেক্টরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল মেয়েটির। তাই প্রতিশোধ স্বরূপ তার বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযুক্ত জানায়, অতীতে কিছু অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে, যাকে হাতিয়ার করে মেয়েটি।
ট্রায়াল কোর্টে শুনানি চলাকালীন বার বার মেয়েটির পোশাক পরিচ্ছদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমনকি সওয়াল জবাব চলাকালীন অভিযুক্তের আইনজীবী বার বার সেই নিয়ে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করেন তরুণীকে। ঘটনার সময় তিনি কী ধরনের পোশাক পরেছিলেন, আঁটসাঁট এবং পশ্চিমি পোশাক পরেন কি না, বারংবার ওই ধরনের প্রশ্ন করা হয়। ওই গোটা বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তোলে দিল্লি হাইকোর্ট। আদালত জানায়, মেয়েটির পোশাকের উপরই জোর দেওয়া হয়েছিল সেই সময়, যা কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য় নয়।
আরও পড়ুন: শেষ পর্যন্ত ফুড ট্রাকে লুকোতে হল ডোনাল্ড ট্রাম্পকে? ইরানের থেকে মাথা বাঁচাতেই কি? দাবি ঘিরে শোরগোল
দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি চন্দ্রশেখরন সুধা নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ, ট্রায়াল কোর্টের সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়ে বলেন, “পোশাক চয়নের উপর যেমন নারীর মর্যাদা নির্ভর করে না, তেমনই পোশাক তাঁর সঙ্গে ঘটা অপরাধের যুক্তিযুক্ত কারণ হতে পারে না। নারীর কেমন পোশাক পরা উচিত, আদালতে এমন প্রশ্ন তোলার জায়গাই নেই। পোশাক পরিচ্ছদ নারীর চরিত্রহনন বা তাঁকে দোষারোপ করার হাতিয়ার হতে পারে না কখনও। এমন সুযোগ দেওয়াই উচিত নয়।”
৫০ পাতার রায়ে আদালত জানিয়েছে, কী পোশাক পরবেন, না পরবেন, তা সম্পূর্ণ ভাবে নারীর ব্যক্তিগত পছন্দ। জিনস পরা কোনও মেয়েকে দেখে ‘পুরুষরা বিপথগামী হতে পারেন’-এমন ধারণা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ধরনের মানসিকতা গ্রহণযোগ্য নয়। আদালতের সাফ বক্তব্য, “কোনও মেয়ে কী পরবেন, তা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার নেই কারও, না পাড়া-পড়শির, না অভিযুক্ত, না অভিযুক্তের আইনজীবীর।”
আদালত জানিয়েছে, মেয়েদের পোশাককে কাঠগড়ায় না তুলে, সন্তানকে ভাল আচরণ, সম্মান এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা শেখানো উচিক মা-বাবা এবং সমাজের। বাড়ির মধ্যে এবং বাইরে প্রত্যেককে সম্মান করতে শেখানো উচিত। ট্রায়াল কোর্টের বিচারকের গোড়াতেই বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তোলা উচিত ছিল বলেও মন্তব্য করেছেন বিচারপতি সুধা। অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
