কলকাতা : ভালবাসতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে। আর কিছু না। আর কিচ্ছু না। চাওয়া-পাওয়ার গণ্ডির অনেকটা বাইরে থাকা একঝাঁক ছেলেমেয়ে, একঝাঁক “ঈশ্বরের দূত” এসে দাঁড়াবে আপনার চারপাশে। ওদের না বলা কথা আপনার কানে বলে যাবে, এই দেখো আমি আছি, আমরা আছি…। আরও একটু সময় কাটাবেন, দূর হয়ে যাবে আপনার দুঃখ-কষ্ট। কোথা থেকে একঝলক ঠান্ডা হাওয়া ছুট্টে এসে ছুঁয়ে যাবে আপনার মুখ, নাড়িয়ে দিয়ে যাবে আপনার মন। আর বলে দিয়ে যাবে, “ওরা যদি পারে, আমি নয় কেন”। নিষ্পাপ মুখগুলো, নির্ভেজাল হাসিগুলো চোখ দিয়ে ছুঁয়ে দেখুন, আপনার মন আপনার অজান্তেই হয়তো বলে উঠবে, “মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও।”
কলকাতার ব্যস্ত শহুরে জীবনের মাঝে এমন একটি ক্যাফে রয়েছে, ক্যাফের কয়ে্কটি শাখা রয়েছে, যেখানে শুধু খাবারের স্বাদ নিতে নয়, মানুষের আত্মবিশ্বাস আর লড়াইয়ের জীবন্ত ছবিটা দেখতেও আসেন মানুষজন। নাম Opportunity Cafe। হার না মানা, অন্ধকারের উৎস থেকে ফুটফুটে কিছু ছেলেমেয়ে শুধু সততাকেই মূলধন করে এগিয়ে চলেছে তাদের স্বপ্ন-পথে।
এই ক্যাফের বিশেষত্ব হল, এখানকার কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বিশেষভাবে সক্ষম ছেলেমেয়েরা। রয়েছেন, সমাজের নানান অন্ধকার গলি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এমন কিছু তরুণ-তরুণী। তাঁরা শুধু ক্যাফের কর্মী নন, নিজেদের দক্ষতা দিয়ে তৈরি করছেন নিজেদের পরিচয়। ‘বিশেষভাবে সক্ষম’ মানেই কারও ক্ষমতা কম – এই পুরনো ধারণাকেই যেন প্রতিদিন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে Opportunity Cafe। এই লড়াইয়ে অগ্র-পথিক যাঁরা- এই জীবন্ত কাহিনিটা তাঁদের নিয়েই।
এই গল্প সেই সব তরুণ-তরুণীর, যাঁদের কেউ শুনতে অক্ষম, কেউ বলতে, কেউ চলার ক্ষেত্রে, কেউ আবার চিন্তা-ভাবনায় পিছিয়ে। কেউ মানব পাচারের শিকার, কেউ উদ্ধার হয়েছেন যৌনপল্লি থেকে। পিছিয়ে থেকেও আজ সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছেন। চেষ্টা করেছেন নিজেদের প্রতিবন্ধকতাকে এক তুড়িতে উড়িয়ে জীবনের জয়গান গেয়ে চলার। কেউ কেউ বলেছেন, ‘লাইফ মে আপনি জিন্দেহি বানায়ে তো কভি দিক্কত নেহি হোগি’। এদের কথাতে যেন হিন্দি সিনেমা ‘আনন্দ’-এর একটি অত্যন্ত বিখ্যাত সংলাপ থাকে- বাবুমশায়, জিন্দেগি বড়ি হোনে চাহিয়ে, লম্বি নেহি।
ওদের জীবনের কোণে কোথাও আটকে থাকা অন্ধকারটা এক ঝটকায় প্রাণপনে টেনে সরানোর কাজটা করে যাচ্ছেন দুই তরুণ। সিদ্ধান্ত ও সুমন্ত। ২০১৩ সাল। সেই বছর বারো আগে থেকে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আলোয় ফেরানোর কাজটা শুরু করেছিলেন যাঁরা। এখনও চলছে সেই কাজ।

জীবনের চ্যালেঞ্জকেই বাস্তব করার লড়াইয়ের আরও এক ধাপ এগিয়ে চলার লক্ষ্য এবার। সেই ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে হাত এখন বাড়িয়েছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। Opportunity Cafe-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সিদ্ধান্ত ঘোষ এবিপি লাইভ বাংলাকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলিপুর ক্যাম্পাসের একটি মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। সেখানে ক্যাফে চালাবে আমাদের ছেলে-মেয়েরা। নাম দেওয়া হবে আশা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও এদের সঙ্গে কমিউনিকেশন করার জন্য কিছুটা সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে সকলের মধ্যেই। আমাদের ছেলেমেয়েরাও উৎসাহ পাবে। আগামী দিনে রাজ্যের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে আমরা এমন উদ্যোগকে তুলে ধরতে পারি, সে চেষ্টাও থাকবে।’

Opportunity Cafe-তে খাবার তৈরি থেকে শুরু করে পরিবেশন, অতিথিদের সঙ্গে যোগাযোগ – বিভিন্ন কাজে অংশ নেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণ-তরুণীরা। তাঁদের পেশাগত দক্ষতা তৈরি করা হয়, যাতে তাঁরা ধীরে ধীরে কর্মক্ষেত্রে নিজেদের দায়িত্ব সামলাতে পারেন। এখন কেউ রান্নাঘরের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, কেউ অতিথিদের পরিষেবা দিচ্ছেন, তো কেউ আবার ক্যাফের দৈনন্দিন কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছেন।
Opportunity Cafe-র সাফল্যের গল্পে এক এক কর্মীর গল্পও এক এক রকমভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রান্নাঘরের দায়িত্ব সামলানোর দক্ষতা অর্জন করেছেন একাধিক জন। কথা বলতে বা শুনতে অসুবিধা থাকলেও নিজের কাজ এবং যোগাযোগের দক্ষতা দিয়ে প্রত্যেকে প্রমাণ করেছেন – সুযোগ পেলে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই সম্ভাবনা রয়েছে।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের জন্য শুধুমাত্র সহানুভূতি যথেষ্ট নয়। তাঁদের প্রয়োজন সুযোগ – শেখার সুযোগ, কাজ করার সুযোগ, ভুল করে আবার শেখার সুযোগ এবং নিজের উপার্জনের মাধ্যমে আত্মনির্ভর হওয়ার সুযোগ। Opportunity Cafe সেই জায়গাটিই তৈরি করতে চাইছে।
এখানে একজন ক্রেতা যখন খাবারের অর্ডার দেন, সেটি শুধু একটি সাধারণ লেনদেন নয়। সেই অর্ডারের মাধ্যমে একজন বিশেষভাবে সক্ষম তরুণ-তরুণী তাঁর কাজের মূল্য পাচ্ছেন, নিজের দক্ষতা প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছেন এবং সমাজের সামনে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ রাখছেন।
Opportunity Cafe-এর পথচলা এখন আর একটি জায়গায় আটকে নেই। কলকাতায় তাদের একাধিক ক্যাফে রয়েছে – উত্তর কলকাতার দমদম এবং দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জে। নিয়মিত ওপেন মাইক-এর মতো অনুষ্ঠানও হয়। ফলে জায়গাটি ধীরে ধীরে শুধু খাবারের ক্যাফে নয়, কলকাতার একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। আর এখানেই সফলতা। কারণ, ক্যাফেতে আসা মানুষ যখন দেখছেন বিশেষভাবে সক্ষম তরুণরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করছেন, তখন তাঁদের সম্পর্কে সমাজের প্রচলিত ধারণাটাও বদলাচ্ছে।
সাফল্য, যে তরুণ একসময় সমাজের অন্ধকার কোনও প্রান্তে ছিলেন, তিনি আজ কর্মক্ষেত্রে নিজের জায়গা তৈরি করছেন। সাফল্য, পরিবারের কাছে তিনি শুধু এখন সবসময় যাকে চোখে চোখে রাখতে হয়, এরকম কেউ নন, বরং একজন দক্ষ কর্মী। সাফল্য, সমাজ তাঁকে করুণার চোখে না দেখে তাঁর কাজের দক্ষতার জন্য মূল্যায়ন করছে। সবচেয়ে বড় সাফল্য, সুযোগ পেলে সক্ষমতার কোনও সীমা থাকে না।
তাই ওদের রোজকার লড়াইয়ে এখন আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন, প্রতি প্লেট সার্ভ করার সঙ্গে থাকে সম্মানের লড়াই, আর প্রতিটি ক্ষণ যেন বলে যায় – সুযোগ পেলে ওরাও পারে। বরং অনেক কিছুই পারে। একটা অপরচুনিটি। ব্যাস…
BJP-CPM Clash : গড়বেতায় মিছিল ফেরত বিজেপি কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ, কাঠগড়ায় সিপিএম, উত্তপ্ত এলাকা
