কলকাতা: পৃথিবীর প্রায় সব জায়গাতেই সাপ রয়েছে। কিন্তু জানেন কি, এমন কয়েকটি দেশ ও অঞ্চল আছে যেখানে স্বাভাবিকভাবে কোনও স্থল সাপের অস্তিত্বই নেই? সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ নিউজিল্যান্ড। তবে শুধু নিউজিল্যান্ড নয়, আয়ারল্যান্ড, আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড এবং অ্যান্টার্কটিকাতেও কোনও স্থানীয় স্থল সাপ নেই। এর পিছনে রয়েছে লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তন, ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা এবং জলবায়ুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
বিশ্বে প্রায় ৪,০০০-এরও বেশি প্রজাতির সাপ রয়েছে। কিন্তু কিছু দ্বীপ ও মেরু অঞ্চল আজও সাপমুক্ত। বিজ্ঞানীদের মতে, এর কারণ ধর্মীয় কাহিনি নয়, বরং সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক।
১. নিউজিল্যান্ড: সমুদ্রের বিচ্ছিন্নতা সবচেয়ে বড় কারণ
নিউজিল্যান্ড পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত Snake-free Country।
প্রায় ৮ কোটি বছর আগে এই দ্বীপপুঞ্জ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখনও আধুনিক সাপ সেখানে পৌঁছতে পারেনি। পরে চারদিকের বিশাল সমুদ্রের কারণে কোনও স্থল সাপ স্বাভাবিকভাবে সেখানে প্রবেশ করতে পারেনি।
বর্তমানে নিউজিল্যান্ডে সাপ আমদানি করা আইনত নিষিদ্ধ। কারণ, সেখানে সাপ ঢুকলে স্থানীয় পাখি, টিকটিকি ও অন্যান্য প্রাণীর ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে। দেশের কঠোর বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থাও এই সাপমুক্ত অবস্থাকে বজায় রেখেছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, মাঝে মাঝে সমুদ্রের সাপ (Sea Snake) নিউজিল্যান্ডের উপকূলে ভেসে এলেও তারা স্থলভাগে স্থায়ীভাবে বসবাস করে না।
২. আয়ারল্যান্ড: সেন্ট প্যাট্রিক নয়, দায়ী বরফ যুগ
প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী সেন্ট প্যাট্রিক নাকি আয়ারল্যান্ড থেকে সব সাপ তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই গল্পকে ঐতিহাসিক সত্য বলে মানেন না।
শেষ বরফ যুগে আয়ারল্যান্ডের অধিকাংশ অঞ্চল বরফে ঢাকা ছিল। পরে বরফ গললেও দ্বীপটি দ্রুত মূল ইউরোপীয় ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে সাপ সেখানে পৌঁছতেই পারেনি।
ফসিল রেকর্ডেও আয়ারল্যান্ডে স্থানীয় সাপের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
৩. আইসল্যান্ড: অত্যন্ত ঠান্ডা জলবায়ু
সাপ শীতল-রক্তের (Cold-blooded বা Ectothermic) প্রাণী। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা বাইরের পরিবেশের উপর নির্ভরশীল।
আইসল্যান্ডের দীর্ঘ শীত, কম তাপমাত্রা এবং আগ্নেয় ভূপ্রকৃতি সাপের বেঁচে থাকার উপযোগী নয়। ফলে সেখানে কখনও স্থানীয় সাপের জনসংখ্যা গড়ে ওঠেনি।
৪. গ্রিনল্যান্ড: প্রকৃতিই সবচেয়ে বড় বাধা
বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের অধিকাংশই বরফে ঢাকা।
চরম ঠান্ডা, দীর্ঘ শীত এবং খাদ্যের অভাব সাপের জন্য একেবারেই অনুকূল নয়। ফলে সেখানে কোনও স্বাভাবিক সাপের জনসংখ্যা নেই।
৫. অ্যান্টার্কটিকা: একমাত্র মহাদেশ যেখানে সাপ নেই
অ্যান্টার্কটিকা পৃথিবীর একমাত্র মহাদেশ যেখানে কোনও স্থানীয় সরীসৃপই নেই।
বছরের অধিকাংশ সময়ই তাপমাত্রা হিমাঙ্কের বহু নিচে থাকে। এমন পরিবেশে সাপ তো দূরের কথা, অধিকাংশ সরীসৃপের পক্ষেই বেঁচে থাকা অসম্ভব।
৬. হাওয়াই: স্থানীয় সাপ নেই
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে কোনও স্থানীয় স্থল সাপ নেই।
এর প্রধান কারণ ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা। প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই দ্বীপে সাপ স্বাভাবিকভাবে পৌঁছতে পারেনি। বর্তমানে সেখানে সাপ রাখা বা আমদানি করার ওপরও কঠোর আইন রয়েছে, যাতে দ্বীপের অনন্য বাস্তুতন্ত্র অক্ষুণ্ণ থাকে। মাঝে মাঝে সমুদ্রের সাপ উপকূলীয় জলে দেখা গেলেও তারা স্থলভাগে বসতি গড়ে না।
কেন এই দেশগুলিতে সাপ নেই? বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
বিজ্ঞানীরা মূলত চারটি কারণকে দায়ী করেন—
ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা (Geographical Isolation): সমুদ্রবেষ্টিত দ্বীপে সাপ পৌঁছতে পারেনি।
বরফ যুগের প্রভাব (Ice Age): বরফ গলার পরও অনেক দ্বীপ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
চরম জলবায়ু (Extreme Climate): অত্যন্ত ঠান্ডা অঞ্চলে সাপ টিকে থাকতে পারে না।
কঠোর বায়োসিকিউরিটি আইন (Biosecurity): বিশেষ করে নিউজিল্যান্ড ও হাওয়াইয়ের মতো অঞ্চলে সাপ প্রবেশ রোধে কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে।
লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তন, ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা এবং জলবায়ুর কারণে কেন কিছু দেশে সাপ নেই? বিস্তারিত বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা
পৃথিবীতে সাপের বিবর্তন (Evolution) শুরু হয়েছিল আনুমানিক ১২ থেকে ১৬.৫ কোটি বছর আগে (Late Jurassic–Early Cretaceous Period)। বিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক সাপের পূর্বপুরুষ ছিল ছোট আকারের টিকটিকি-জাতীয় সরীসৃপ। লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ফলে তাদের পা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়, দেহ দীর্ঘ ও নমনীয় হয়ে ওঠে এবং তারা বিভিন্ন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়।
কিন্তু পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে সাপ সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। এর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি কারণ হল— ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা (Geographical Isolation), বিবর্তনের সময়কাল (Evolutionary History) এবং জলবায়ু (Climate)।
১. ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা (Geographical Isolation): সাপ পৌঁছতেই পারেনি
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোনও প্রাণী নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার জন্য একটি স্বাভাবিক পথ বা “Migration Route” প্রয়োজন। এই পথ হতে পারে স্থলভাগ, প্রাকৃতিক সেতু (Land Bridge), নদী বা উপকূলীয় এলাকা।
কিন্তু নিউজিল্যান্ড প্রায় ৮ কোটি বছর আগে প্রাচীন সুপার-কন্টিনেন্ট গন্ডওয়ানা (Gondwana) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন আধুনিক সাপের বৈচিত্র্য এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ফলে সাপ সেই দ্বীপে পৌঁছানোর সুযোগই পায়নি।
এরপর চারদিকে হাজার হাজার কিলোমিটার সমুদ্র প্রাকৃতিক দেয়ালের মতো কাজ করেছে। অধিকাংশ স্থল সাপ দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে পারে না। যদিও কিছু সাপ ভাসমান গাছ বা উদ্ভিদের সঙ্গে অল্প দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে, কিন্তু নিউজিল্যান্ডের মতো এত দূরের দ্বীপে স্বাভাবিকভাবে পৌঁছানো কার্যত অসম্ভব ছিল।
একই ঘটনা ঘটেছে হাওয়াই ও অনেক দূরবর্তী আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জের ক্ষেত্রেও।
২. বিবর্তনের সময়কাল (Evolutionary Timing): সময়ের হিসাবই বদলে দিয়েছে ইতিহাস
প্রাণীদের বিস্তার কখন হয়েছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ধরা যাক, কোনও দ্বীপ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল এমন সময়ে, যখন কোনও নির্দিষ্ট প্রাণী এখনও সেখানে পৌঁছায়নি। পরে সেই প্রাণী পৃথিবীর অন্যত্র ছড়িয়ে পড়লেও ওই দ্বীপে আর পৌঁছাতে পারবে না।
এটিই “Evolutionary Timing” নামে পরিচিত।
নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দ্বীপটি যখন আলাদা হয়ে যায়, তখন সাপ সেখানে উপস্থিত ছিল না। ফলে পরবর্তী কোটি কোটি বছরেও সেখানে সাপের স্বাভাবিক জনসংখ্যা তৈরি হয়নি।
৩. বরফ যুগ (Ice Age): ইউরোপের ইতিহাস বদলে দেয়
প্রায় ২৬ লক্ষ বছর আগ শুরু হওয়া প্লাইস্টোসিন (Pleistocene) বরফ যুগে উত্তর ইউরোপের বিশাল অংশ বরফে ঢেকে যায়।
আয়ারল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের অধিকাংশ অঞ্চল দীর্ঘ সময় বরফে আচ্ছাদিত ছিল। এত ঠান্ডায় সাপ টিকে থাকতে পারেনি।
পরে যখন বরফ গলতে শুরু করে, তখন সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পায় এবং আয়ারল্যান্ড মূল ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে ইউরোপে সাপ থাকলেও তারা আর আয়ারল্যান্ডে পৌঁছাতে পারেনি।
এ কারণেই আয়ারল্যান্ডে স্থানীয় সাপের কোনও জীবাশ্ম (Fossil) পাওয়া যায় না।
৪. জলবায়ু (Climate): ঠান্ডা আবহাওয়া সাপের সবচেয়ে বড় শত্রু
সাপ হল *Ectothermic* বা শীতল-রক্তের প্রাণী।
অর্থাৎ তারা নিজের শরীরের তাপ উৎপন্ন করতে পারে না। শরীরের তাপমাত্রা সম্পূর্ণ নির্ভর করে বাইরের পরিবেশের উপর।
যদি দীর্ঘ সময় তাপমাত্রা খুব কম থাকে—
* শরীরের বিপাকক্রিয়া (Metabolism) কমে যায়।
* খাদ্য হজম হয় না।
* চলাফেরা ধীর হয়ে যায়।
* শিকার ধরা কঠিন হয়।
* প্রজনন ব্যাহত হয়।
* দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা টিকে থাকতে পারে না।
এই কারণেই গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং অ্যান্টার্কটিকায় স্থায়ী সাপের জনসংখ্যা কখনও গড়ে ওঠেনি।
৫. খাদ্য ও বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem): শুধু জলবায়ু নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত শিকারও
একটি প্রাণী নতুন অঞ্চলে টিকে থাকতে গেলে শুধু উপযুক্ত তাপমাত্রাই যথেষ্ট নয়।
সেখানে থাকতে হবে—
* ইঁদুর
* ব্যাঙ
* টিকটিকি
* ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী
* পাখির ডিম
* নিরাপদ আশ্রয়
* প্রজননের উপযোগী পরিবেশ
অ্যান্টার্কটিকার মতো অঞ্চলে এই খাদ্যশৃঙ্খলই নেই। ফলে সাপ সেখানে টিকে থাকার কোনও বাস্তব সুযোগ পায় না।
বিজ্ঞানীরা কী বলেন?
জীববিজ্ঞানীদের মতে, কোনও অঞ্চলে সাপ থাকবে কি না, তা নির্ধারণ করে চারটি প্রধান বিষয়—
* অঞ্চলটি কখন মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
* সাপ সেই সময় সেখানে পৌঁছেছিল কি না।
* স্থানীয় জলবায়ু সাপের বেঁচে থাকার উপযোগী কি না।
* খাদ্য, আশ্রয় ও প্রজননের জন্য পর্যাপ্ত বাস্তুতন্ত্র রয়েছে কি না।
অর্থাৎ, কোনও দেশে সাপ না থাকার কারণ কোনও অলৌকিক ঘটনা নয়। এটি কোটি কোটি বছরের বিবর্তন, মহাদেশের স্থানান্তর (Plate Tectonics), বরফ যুগ, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের (Natural Selection) সম্মিলিত ফল।
গবেষণা ও তথ্যসূত্র
এই প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে নিম্নলিখিত নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে—
* National Geographic (Snakes Facts, Why Ireland Has No Snakes)
* বৈজ্ঞানিক সরীসৃপ গবেষণার তথ্যভান্ডার ও প্রাকৃতিক ইতিহাসভিত্তিক গবেষণা
* নিউজিল্যান্ডের বায়োসিকিউরিটি সংক্রান্ত সরকারি নীতির সারাংশ
* সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংবাদ ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিবেদন
MRC-র নতুন পরিষেবা, মিলবে রোবোটিক থেরাপি ও AI দ্বারা পরিচালিত মেডিক্যাল রিহ্যাবিলিটেশনের সুবিধা
