কলকাতা: মানুষের আসল উচ্চতা কি সত্যিই ফুট-ইঞ্চিতে মাপা যায়? অসমের শিক্ষক সঞ্জীব মজুমদারের জীবন যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর। তাঁর উচ্চতা মাত্র তিন ফুট। ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে তাঁকে দাঁড়াতে হয় বেঞ্চের উপর। দৈনন্দিন জীবনের বহু সাধারণ কাজও তাঁর কাছে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন। কিন্তু সেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে কখনও নিজের স্বপ্নের পথে বাধা হতে দেননি তিনি।
আজ সেই সঞ্জীবই ছাত্রছাত্রীদের প্রিয় শিক্ষক। দীর্ঘ ১৮ বছরের নিষ্ঠা, সংগ্রাম এবং শিক্ষার প্রতি ভালবাসার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালে পেয়েছেন জোরহাট জেলার সেরা শিক্ষকের সম্মান।
মাত্র ৩ ফুট উচ্চতা, কিন্তু স্বপ্ন ছিল অনেক বড়
অসমের জোরহাট জেলার তিতাবরের বাসিন্দা সঞ্জীব মজুমদার। ছোটবেলা থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তাঁকে বহু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু নিজের উচ্চতাকে কখনও দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি।
বর্তমানে তিতাবরের শ্রীমন্ত শঙ্কর বিদ্যাপীঠে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত সঞ্জীব। তাঁর কাছে শিক্ষকতা শুধুমাত্র একটি সরকারি চাকরি নয়, বরং সমাজ গড়ার একটি দায়িত্ব।
২০০৮ সালে শুরু শিক্ষকতার জীবন
২০০৮ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরি শুরু করেন সঞ্জীব। প্রথম দিকে তাঁর কর্মস্থল ছিল জোরহাটে। শারীরিক অবস্থার কারণে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ যাতায়াত করা তাঁর কাছে অত্যন্ত কঠিন ছিল।
কিন্তু সেই কষ্টও তাঁকে থামাতে পারেনি। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর নিজের দায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন তিনি।
পরে তিনি স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে চারিগাঁওয়ের একটি স্কুলে শিক্ষকতার দায়িত্ব নেন। টানা সাত বছর কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে স্কুলে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়েছেন।
২০১৫ সালে তাঁকে তিতাবরের একটি স্কুলে বদলি করা হয়। নতুন কর্মস্থলটি তাঁর বাড়ি থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে। সঞ্জীব জানিয়েছেন, সেই সময় জোরহাটের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার বিশাল বসন্ত সোলাঙ্কি তাঁকে এই স্কুলে বদলির ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিলেন।
বেঞ্চে দাঁড়িয়ে পড়ান ছাত্রছাত্রীদের
প্রতিদিন ক্লাসরুমে ঢোকার পর সঞ্জীবের সামনে থাকে একটি বিশেষ চ্যালেঞ্জ। তাঁর উচ্চতা মাত্র তিন ফুট হওয়ায় সাধারণভাবে দাঁড়িয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা বা ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো তাঁর পক্ষে সহজ নয়।
তাই ক্লাসে পড়ানোর সময় তিনি বেঞ্চের উপর দাঁড়ান।
কিন্তু এই দৃশ্য তাঁর ছাত্রছাত্রীদের কাছে কোনও দুর্বলতার প্রতীক নয়। বরং তাঁদের কাছে শিক্ষকের এই লড়াই সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং হার না মানার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
বইয়ের পাঠ পড়ানোর পাশাপাশি নিজের জীবন দিয়েই ছাত্রছাত্রীদের শেখাচ্ছেন সঞ্জীব—পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, চেষ্টা বন্ধ করা যায় না।
শুধু পড়ানো নয়, স্কুলের সব কাজেই এগিয়ে
শিক্ষকের দায়িত্ব শুধুমাত্র ক্লাসরুমেই সীমাবদ্ধ রাখেননি সঞ্জীব। স্কুলের প্রায় প্রতিটি কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি।
মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা দেখা থেকে শুরু করে স্কুল চত্বরের পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব, এমনকী বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজেও সহযোগিতা করেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি স্কুলের অন্যতম দায়িত্বশীল এবং নির্ভরযোগ্য শিক্ষক।
তাঁর বিশ্বাস, কোনও কাজই ছোট নয়। যে দায়িত্বই দেওয়া হোক, তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করাই তাঁর লক্ষ্য।
১৮ বছরের লড়াইয়ের স্বীকৃতি
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে বহু ভাল এবং খারাপ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে সঞ্জীবকে। কিন্তু তাঁর কথায়, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কাটানো সময়ই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত।
১৮ বছরের সেই নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের বড় স্বীকৃতি আসে ২০২৫ সালে। শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে জোরহাট জেলার সেরা শিক্ষক পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।
সঞ্জীবের কাছে এই পুরস্কার তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
চারটি নির্বাচনে পালন করেছেন দায়িত্ব
শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অতিরিক্ত সরকারি দায়িত্ব থেকে নিজেকে কখনও সরিয়ে রাখেননি সঞ্জীব। এখনও পর্যন্ত চারটি নির্বাচনে ডিউটি করেছেন তিনি।
তাঁর একমাত্র অনুরোধ থাকে, শারীরিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে প্রশাসন যেন যাতায়াতের জন্য একটি ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবস্থা করে।
অনেকেই যেখানে অতিরিক্ত সরকারি দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চান, সেখানে সঞ্জীব স্বেচ্ছায় সেই দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কথায়, মানুষের সাহায্য করার জন্যই যেন তাঁর জন্ম।
স্কুলের বাইরেও ছাত্রছাত্রীদের পাশে
স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজলেই সঞ্জীবের শিক্ষকতার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। স্কুলের পরেও তিনি ছাত্রছাত্রীদের পড়ান। প্রতি বছর মেধাবী পড়ুয়াদের নিজের উদ্যোগে পুরস্কৃত করেন, যাতে তারা আরও ভাল ফল করার উৎসাহ পায়।
স্কুলের বাইরেও বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে সক্রিয় তিনি। বাড়িতে মায়ের সঙ্গে সংসারের কাজেও সাহায্য করেন।
তাঁর কাছে শিক্ষকতা কোনও পেশা নয়, এটি সমাজসেবার একটি মিশন।
কদ নয়, কর্মই তৈরি করেছে পরিচয়
মাত্র তিন ফুট উচ্চতার কারণে জীবনের পথে সঞ্জীব মজুমদারকে কতবার বাধার মুখে পড়তে হয়েছে, তার সম্পূর্ণ হিসেব হয়তো কারও জানা নেই। কিন্তু তাঁর সাফল্যের হিসেব আজ সকলের সামনে।
যে শিক্ষককে ব্ল্যাকবোর্ডে পৌঁছতে বেঞ্চের উপর দাঁড়াতে হয়, তিনিই আজ জেলার সেরা শিক্ষক। যাঁর কাছে প্রতিদিন ৩০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে স্কুলে যাওয়া ছিল কঠিন, তিনিই টানা সাত বছর সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও চারটি নির্বাচনে সরকারি দায়িত্বও সামলেছেন।
সঞ্জীব মজুমদারের গল্প তাই শুধু একজন শিক্ষকের সাফল্যের গল্প নয়। তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয়—মানুষ কতটা বড়, তা তার উচ্চতা ঠিক করে না; ঠিক করে তার সাহস, পরিশ্রম এবং অন্যের জীবনে আলো ছড়ানোর ক্ষমতা।
Education Loan Information:
Calculate Education Loan EMI
