কলকাতা : আজ থেকেই পশ্চিমবঙ্গে কার্যকর হয়ে গেল ‘গুন্ডাদমন আইন’। বিক্ষোভ-প্রতিবাদের নামে সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নষ্ট করলে এবার থেকে কড়া পদক্ষেপ করতে পারবে রাজ্য সরকার। ২৯ জুন বিধানসভায় পাস হয় গুন্ডা-দমন সংক্রান্ত ২টি বিল। নতুন এই আইনের ফলে এবার আইনশৃঙ্খলার গুরুতর অবনতি থেকে হিংসাত্মক বিক্ষোভের আঁচ পেলেই গ্রেফতার করা যাবে অভিযুক্তদের। এছাড়া যে কোনও সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি নষ্টের ক্ষেত্রে এবার থেকে গুন্ডাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে রাজ্য সরকার।
এই আইনে কী বলা হয়েছে ?
গুন্ডাদমন আইন অনুযায়ী, ঘটনা ঘটনার আগেই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারবে পুলিশ। এছাড়া যে কোনও সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি নষ্টের ক্ষেত্রে এবার থেকে গুন্ডাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তও করতে পারবে সরকার।
দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেনেন্স অফ পাবলিক অর্ডার সংশোধনী আইন অনুযায়ী বিক্ষোভ, দাঙ্গা, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের জেরে সরকারি বা ব্য়ক্তিগত সম্পত্তি নষ্ট করলে তার ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবে সরকার। এর জন্য অভিযুক্তের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যেতে পারে। ‘ক্লেমস কমিশনে’র কাছে আবেদন করে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এক্ষেত্রে ‘ক্লেমস কমিশন’কে দেওয়ানি আদালত হিসেবে গণ্য করা হবে। কমিশনের রায়কেই চূড়ান্ত বলে গণ্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বিলে। অপরাধীর পাশাপাশি উস্কানি দিলে বা অর্থ জোগান দিলে এবং সংগঠক ও অভিযুক্তের আশ্রয়দাতাকেও অভিযুক্ত হিসেবে গণ্য় করা হবে।
সমাজবিরোধী কার্যকলাপ কী ?
১. এই আইন অনুযায়ী সমাজবিরোধী কার্যকলাপ বলতে বলা হয়েছে, জনগণের মধ্যে আতঙ্ক, বিপদ, ভয় বা নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করা।
২. জনশৃঙ্খলা বা জনশান্তিকে বিঘ্নিত করা।
৩. মানুষের অধিকার, বৈধ ব্যবসা, পেশা বা জীবিকার স্বাভাবিক কার্যকলাপে বাধা সৃষ্টি করা।
৪. কারোর স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি থেকে বেআইনিভাবে তাকে উচ্ছেদ করা।
৫. কোনও ঘটনার জন্য সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করা।
আরও পড়ুন – গুন্ডা কারা ? সমাজবিরোধী কাজ কী কী ? কীভাবে শাস্তি ? রাজ্য আনছে নয়া বিল
এই আইনে গুন্ডা বলতে প্রধানত কাকে বলা হয়েছে ?
এই আইন অনুযায়ী কেউ নিজে অথবা কোনও দলকে কাজে লাগিয়ে, গ্যাং বা সিন্ডিকেটের সদস্য বা নেতা হিসেবে নিয়মিতভাবে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ করেন বা করার চেষ্টা করেন, উস্কানি দেন, অর্থ জোগান বা সহায়তা করেন এমন ব্যক্তিকে গুন্ডা বলা হয়।
ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩-এর ধারা ১১১ বা ১১২-এর অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধে চার্জশিট পাওয়া কোনও ব্যক্তি। অস্ত্র আইন ১৯৫৯, মাদক আইন ১৯৮৫, অনৈতিক পাচার (প্রতিরোধ) আইন ১৯৫৬ বা ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেন, করার চেষ্টা করেন, সাহায্য করেন, প্রচার করেন বা অর্থ জোগান দেন এমন ব্যক্তিকে বলা হয়।
এই আইনে রাজ্য সরকারের ভূমিকা কী ?
১. গুন্ডাদমন আইনে বলা হয়েছে, রাজ্য সরকার যদি পুলিশ সুপারের নীচে নয় এমন পদমর্যাদার কোনও অফিসারের রিপোর্টের ভিত্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে কোনও গুন্ডাকে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখতে আটক করার প্রয়োজন পড়ে, তাহলে সরকার ওই ব্যক্তিকে আটক করার নির্দেশ দিতে পারে।
২. ওই আটক করা ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১ বছর পর্যন্ত আটক করে রাখা যাবে।
৩. এই আইনের উদ্দেশ্যপূরণের জন্য রাজ্য সরকার এক বা একাধিক উপদেষ্টা বোর্ড গঠন করবে এবং তাদের আঞ্চলিক বা কার্যক্ষেত্র নির্ধারণ করতে পারবে।
৪. এই আইনের অধীনে কাউকে আটকের আদেশ জারি হলে, রাজ্য সরকার আটকের তারিখ থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে উপদেষ্টা বোর্ডের সামনে উপস্থাপন করবে।
৫. বোর্ড আটকের তারিখ থেকে ৯ সপ্তাহের মধ্যে রাজ্য সরকারকে রিপোর্ট দেবে এবং আলাদা অনুচ্ছেদে জানাবে আটক রাখার যথেষ্ট কারণ আছে কি না।
৬. যদি বোর্ড জানায় যে আটক রাখার যথেষ্ট কারণ আছে, তবে রাজ্য সরকার আটকের আদেশ বহাল রাখতে পারে। যদি বোর্ড জানায় যে আটক রাখার যথেষ্ট কারণ নেই, তাহলে রাজ্য সরকার আটকের আদেশ বাতিল করবে এবং ব্যক্তিকে অবিলম্বে মুক্তি দেবে।
৭. এই ধারার কোনও কিছুই আটক ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনজীবীর মাধ্যমে উপস্থিত হওয়ার অধিকার দেয় না। সহজ ভাষায়, এই অংশে বলা হয়েছে যে, আটক ব্যক্তির মামলা পরে একটি বিচারপতি-নেতৃত্বাধীন বোর্ড পর্যালোচনা করবে। কিন্তু সাধারণ নিয়মে সেখানে সরাসরি আইনজীবী নেওয়ার অধিকার সীমিত রাখা হয়েছে।
কীভাবে শাস্তি ?
আইন অনুযায়ী, কোনও সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করতে হলে পুলিশ সুপার বা তাঁর ওপরের পদমর্যাদার আধিকারিকের রিপোর্ট লাগবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার আটকের নির্দেশ দিতে পারবে। গত ৭ বছরের মধ্যে কোনও ব্যক্তি যদি কোনও অপরাধে অন্তত একবার আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকেন, অথবা একই ঘটনার অংশ নয় এমন কমপক্ষে ৩ টি পৃথক মামলায় চার্জশিটভুক্ত হয়ে থাকেন, তাঁকেও আটক করা যাবে। CP বা DM আটকের নির্দেশ দিলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে থাকা তথ্যপ্রমাণ দিয়ে অবিলম্বে রাজ্যের DGP-কে জানাতে হবে।
