কলকাতা: ‘কালীঘাট-তৃণমূলে’ আরও বড় ধাক্কা। এবার ‘ঋতব্রত তৃণমূলে’ মদন মিত্র। ‘কালীঘাট-তৃণমূলে’র সমস্ত পদ ছেড়ে দিলেন কামারহাটির বিধায়ক। ফিরহাদ হাকিম, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের পর এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছাড়লেন তাঁর স্নেহের মদনও। তৃণমূল থেকে সব পদ ছেড়েই সটান বিধানসভায় পৌঁছে গিয়েছেন তিনি। এই মুহূর্তে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করছেন তিনি। এর আগে সন্দীপন সাহার সঙ্গেও দেখা করেন তিনি। (Madan Mitra)
মমতার রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী মমতা। মমতা যখন যুব কংগ্রেসে, সেই সময়ও নেত্রীর পাশে দেখা যেত তাঁকে। মমতা তৃণমূল তৈরির পরও সেভাবেই ছিলেন। এমনকি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পরও নেত্রীর পাশেই দেখা যাচ্ছিল তাঁকে। অন্যরা যখন বিদ্রোহ করছেন, সেই সময় তাঁদের কটাক্ষও করেছেন। এবার সেই মদন নিজেই মমতার হাত ছাড়লেন। নেত্রীর দেওয়া হালফিলের সব পদও ছেড়ে দিলেন। ‘কালীঘাট তৃণমূলে’র তরফে চিফ হুইপ করা হয়েছিল মদনকে। সেই পদ চেড়ে দিয়েছেন। (TMC News)
বুধবার সকালে নিজের বাড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে বেরোন মদন। নিজেই ড্রাইভ করে বিধানসভায় পৌঁছন। বিরোধী দলনেতা ঋতব্রতর ঘরে ঢুকে যান। আর সেখান থেকেই তৃণমূলের সব পদ ছাড়ার ঘোষণা করেন। ঋতব্রতর পাশে বসে বলেন, “কবিতাটা ছোট্ট, দু’লাইনের- জীবন-মরণ, সাঁকোর সামনে বয়স এখন দাঁড়িয়ে, এখন তোমায় বুঝতে হবে, কী হবে, আর কী হবে না। কোন সাঁকোটা পারাপারের, কোন সাঁকোটা পার হবে না। জীবনের এই মুহূর্তটায় এসে আমি দাঁড়িয়েছি। এটা ঠিক যে আমি তৃণমূলের বিধায়ক। কিন্তু তৃণমূলের বিধায়ক নই শুধু, আমি বাংলার বিধায়ক। বিধানসভার সদস্য। তৃণমূলের সব ছেড়ে দিলাম মানে দলের বিধায়ক নই। যত পদ ছিল না, কলাপাতায় লিখে দেওয়া পদ। সব ছেড়ে দিলাম। দুঃখের বিষয় যখন ইতিহাস লেখা হবে বাংলার এই সময় নিয়ে, লেখা হবে যে, একটা লোকের জন্য গোটা দল, যারা ২১৩টি আসন পেয়েছিল, তাদের সর্বনাশ হয়ে যায়।”
তাহলে ২১ জুলাই কোন মঞ্চে দেখা যাবে মদনকে? তিনি বলেন, “এখনও পর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির যে চিন্তাধারা, মানচিত্র, সবেতেই কিন্তু AITC লেখা আছে। তার মধ্যে আবার দু’টো ভাগ হয়েছে। আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সম্মান জানিয়ে, ধন্যবাদ জানিয়ে…দীর্ঘদিন তিনি আমাদের পাশে থেকেছেন, আমরাও চেষ্টা করেছি কমবেশি করার। আজ এই মুহূর্ত থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের ন্যাশনাল কমিটির চিফ হুইপ, ওয়র্কিং কমিটি, পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি থেকে সব পদ থেকে ইস্তফা দিলাম আমি। আমাকে আজ থেকে…আমি তৃণমূলে ছিলাম, তৃণমূলেই রইলাম। শুধু আমি এই ঘর থেকে ওই ঘরে গেলাম। ওই ঘরে হয়ত একটা সুখের পালঙ্ক ছিল। এই ঘরে হয়ত খাটিয়ে রয়েছে একটা। আমি খাটিয়ার দিকটাই বেছে নিলাম।” ঋতব্রত শিবিরে যোগ দিয়ে মদন বলেন, “ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস, এই ঝড় তুফানে পরিণত হবে। আমরা চলি সমুখ পানে, কে আমাদের বাঁধবে, রইল যারা পিছুটানে কাঁদবে তারা কাঁদবে।” এটা কিসের ইঙ্গিত জানতে চাইলে বলেন, “আগামীর ইঙ্গিত, বদলের ইঙ্গিত, ঝড়ের ইঙ্গিত, পতনের ইঙ্গিত, নতুন করে বদল আসছে।”
কেন মমতার হাত ছাড়লেন মমতা? মদন কার্যত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই নিশানা করছেন। জানিয়েছেন, দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছে অভিষেককে সরানোর ব্যাপারে অনুনয় বিনয় করেছিলেন। কিন্তু কর্ণপাত করা হয়নি। তাই ঋতব্রত শিবিরে যোগ দিচ্ছেন। মদন জানিয়েছেন, অনেকে ভাবতে পারেন তিনি ভয়ে যাচ্ছেন। তা কিন্তু নয়। মমতার কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন মদন।হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে মমতাকে ‘সরি’ লিখে পাঠিয়েছেন তিনি। জানিয়েছেন, মমতা অনেক দিয়েছেন তাঁকে। দলের জন্য তিনিও জেল খেটেছেন। কিন্তু তাঁর আবেদনে দল সাড়া দেয়নি বলে জানালেন মদন।
পুরসভা নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় মদনের স্ত্রী এবং দুই ছেলেকে তলব করেছে ইডি। ২২ এবং ২৩ জুলাই হাজিরা দিতে হবে। ‘কালীঘাট তৃণমূলে’ যোগ দেওয়ার সঙ্গে তার কোনও যোগ রয়েছে কি না জানতে চাইলে মদন বলেন, “রাজনীতি আর ব্যক্তিগত জীবন আলাদা জিনিস। আমার পিরবারকে ডাকা হয়েছে। এজেন্সিদের সেই ক্ষমতা রয়েছে, ডাকতে পারে। আমরা সর্বতো ভাবে সহযোগিতা করব। তার সঙ্গে আজকের এই যোগ দেওয়াটার যোগ নেই।” ২১ জুলাইয়ের ঠিক আগে মদন শিবির বদল করায় মমতা আরও একা হয়ে পড়লেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
