কলকাতা: উত্তর বঙ্গোপসাগরে পশ্চিমবঙ্গ–বাংলাদেশ উপকূল সংলগ্ন এলাকায় বর্তমানে একটি উচ্চস্তরের ঘূর্ণাবর্ত (Upper Air Cyclonic Circulation) সক্রিয় রয়েছে। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস, অনুকূল পরিস্থিতি থাকলে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, অর্থাৎ ৩ জুলাই নাগাদ এটি নিম্নচাপ এলাকায় (Low Pressure Area) পরিণত হতে পারে।
এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে কি ঘূর্ণিঝড় আসছে? উত্তর দিয়েছেন আবহবিদ রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা।
উত্তর হল, একেবারেই তা নয়। আসলে ‘সাইক্লোনিক সার্কুলেশন’ বা ঘূর্ণাবর্ত এবং ‘সাইক্লোন’ বা ঘূর্ণিঝড়—এই দুইয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ঘূর্ণাবর্ত হল বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে তৈরি হওয়া একটি ঘূর্ণনশীল বায়ুপ্রবাহ, যা অনেক সময় আবহাওয়ার পরিবর্তনের সূচনা করে। তবে প্রতিটি ঘূর্ণাবর্ত যে শেষ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে মিলিয়ে যায়।
অনুকূল পরিবেশ, পর্যাপ্ত জলীয় বাষ্প এবং বায়ুর সমর্থন পেলে একটি ঘূর্ণাবর্ত ধীরে ধীরে নিম্নচাপ, তারপর সুস্পষ্ট নিম্নচাপ, ডিপ্রেশন, ডিপ ডিপ্রেশন এবং শেষ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে।
এই ধাপগুলির মধ্যে মূল পার্থক্য নির্ধারণ করা হয় বাতাসের গতিবেগ এবং বায়ুচাপের পরিবর্তনের ভিত্তিতে। বাতাসের গতি যত বাড়ে এবং কেন্দ্রীয় বায়ুচাপ যত কমে, আবহাওয়া ব্যবস্থাটি তত শক্তিশালী হয়।
ঘূর্ণাবর্তের সময় কোথাও আকাশ পরিষ্কার থাকতে পারে, কোথাও আংশিক মেঘলা আকাশ, আবার কোথাও স্বল্প সময়ের বজ্রবৃষ্টি বা দমকা হাওয়া দেখা দিতে পারে। কিন্তু নিম্নচাপ ও তার পরবর্তী ধাপগুলিতে মেঘের বিস্তার, বৃষ্টির পরিমাণ এবং বাতাসের বেগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
তাই শুধুমাত্র ‘ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছে’ শুনেই আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। এটি বর্ষাকালে একটি স্বাভাবিক আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া। পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে আবহাওয়া দফতর। পরবর্তী কয়েক দিনে এই ব্যবস্থা কতটা শক্তি সঞ্চয় করে, তার উপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতের আবহাওয়ার চিত্র।
বর্ষাকালে ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হলেও সব ক্ষেত্রে তা ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয় না। কারণ, এই সময় অধিকাংশ ঘূর্ণাবর্তই উপকূলের খুব কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়। ফলে সমুদ্রের উপর দীর্ঘ সময় অবস্থান করার সুযোগ পায় না। সমুদ্র থেকে পর্যাপ্ত শক্তি ও জলীয় বাষ্প সংগ্রহের আগেই এগুলি স্থলভাগের দিকে অগ্রসর হয়। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ধরনের আবহাওয়া ব্যবস্থা নিম্নচাপ হিসেবেই থেকে যায়। কিছু ক্ষেত্রে তা সুস্পষ্ট নিম্নচাপ, ডিপ্রেশন বা ডিপ ডিপ্রেশন-এ পরিণত হলেও উপকূলে আছড়ে পড়ার পর দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়। ফলে বর্ষাকালে তৈরি হওয়া প্রতিটি ঘূর্ণাবর্ত যে শেষ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেবে, এমন ধারণা একেবারেই সঠিক নয়।
