নয়াদিল্লি: ছেলে ভরতের দৌলতে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন শকুন্তলা। ‘মহাভারতে’র সেই কাহিনির বাস্তবরূপ ধরা পড়ল একবিংশ শতাব্দীতে, ভারত থেকে বহু দূরের বেলজিয়ামে। সেলসম্যান যুবককে ছেলে হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হলেন বেলজিয়ামের রাজা ফিলিপের ভাই, যুবরাজ প্রিন্স লরেন্ট। (Clément Vandenkerckhove)
সাধারণ পরিবারের ছেলে হিসেবেই বেড়ে ওঠেন বছর বয়সি ক্লেমেন্ট ভ্যানডেনকার্কহোভ। ২৬ বছর বয়সে রাজ পরিবারের সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন। এতদিন সেলসম্যান হিসেবে গাড়ির শোরুমে কাজ করতেন ক্লেমেন্ট। মা আইরিস সঙ্গীতশিল্পী। একসময় মডেল হিসেবেও খ্যাতি পেয়েছিলেন। তবে আইরিস নন, তিনি পরিচিত ছিলেন ওয়েন্ডি ভ্যান ওয়ান্তেন নামে। (Belgium Royal Family)
আরও পড়ুন: ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র অভিজিৎ দীপকের বিরুদ্ধে FIR দায়ের, একাধিক অপরাধমূলক ধারায় মামলা
নয়ের দশকে প্রিন্স লরেন্ট এবং আইরিসকে নিয়ে মুখরোচক খবর শোনা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে গুঞ্জন থিতিয়ে আসে। ২০০৩ সালে ক্লেয়ার লুই কুম্বসের সঙ্গে বিয়ে হয় প্রিন্স লরেন্টের। তাঁদের তিন সন্তান, রাজকুমারী লুই, রাজপুত্র নিকোলাস এবং আয়মেরিক। অন্য দিকে, ক্লেমেন্টের জন্ম ২০০০ সালের অগাস্ট মাসে। একাকী মায়ের সন্তান হিসেবেই বেড়ে ওঠেন ক্লেমেন্ট। ১৬ বছর বয়সে প্রথম বাবার আসল পরিচয় জানতে পারেন তিনি। তবে মায়ের মতো তিনিও মুখে কুলুপ এঁটেই ছিলেন।
২০২৫ সালে ক্লেমেন্টের বাবার পরিচয় নিয়ে নতুন করে গুঞ্জন শুরু হয়। কারণ ওই বছরই টেলিভিশনে সম্প্রচারিত একটি তথ্যচিত্রে অংশ নেন ক্লেমেন্ট। নিজের পরিবারের ইতিহাস নিয়ে কথা বলেন তিনি। তাতেই প্রিন্স লরেন্টের ‘লুকিয়ে রাখা সন্তান’কে নিয়ে নতুন করে গুঞ্জন জোর পায়। শেষ পর্যন্ত ক্লেমেন্টকে সন্তান হিসেবে মেনে নেন প্রিন্স লরেন্টও। জানান, একান্তে ক্লেমেন্টের সঙ্গে কথা হয়েছে। সম্প্রতি পরস্পরের সান্নিধ্য পেয়েছেন তাঁরা।
মাস ছয়েক আগে খবর আসে, গোপন অনুষ্ঠানে রাজপরিবারের সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ক্লেমেন্টকে। তবে মুখের কথায় যে ক্লেমেন্টকে সন্তান হিসেবে মেনে নেননি প্রিন্স লরেন্ট, তা বোঝা গেল এবার। জানা গিয়েছে, DNA পরীক্ষা করিয়েছিলেন তিনি, যাতে ক্লেমেন্ট এবং তাঁর মধ্যে ৯৯.৫ শতাংশ মিল ধরা পড়ে। এর পরই ক্লেমেন্টের পিতৃত্ব স্বীকার করে নেন তিনি, আইনি স্বীকৃতি প্রদান করেন। DNA পরীক্ষার বিষয়টি সামনে এসেছে সম্প্রতি। মায়ের কাছ থেকে সত্য জানার চার বছর পর ক্লেমেন্ট প্রিন্স লরেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে জানা গিয়েছে।
রাজ পরিবারের সন্তান হিসেবে প্রিন্স লরেন্টের ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর সমান অধিকার ক্লেমেন্টের। তবে তিনি সিংহাসনের দাবিদার হতে পারবেন না। রাজপরিবারের কোনও দায়-দায়িত্বও বর্তাবে না তাঁর উপর। নাগরিকদের রাজস্ব থেকে রাজ পরিবারের যে আয়, তার উপরও কোনও দাবি থাকবে না তাঁর। শুধুমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পত্তির ভাগ পাবেন। নিজের নামের পাশে রাজ পরিবারের পদবী Saxe-Coburg ব্যবহার নিয়েও ইতস্তত করছেন ক্লেমেন্ট। মায়ের পদবী নিয়েই গর্ববোধ করেন তিনি। তাঁর কথায়, “আমি মায়ের পদবী নিয়ে গর্ব বোধ করি। এখন পদবী ত্যাগ করলে মায়ের আত্মত্যাগ, তাঁর লড়াইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।”
এই ঘটনায় বেলজিয়াম রাজপরিবারের অতীতের বিতর্কও সামনে চলে এসেছে। প্রিন্স লরেন্টের বাবা, বেলজিয়ামের প্রাক্তন রাজা, ৯২ বছর বয়সি দ্বিতীয় অ্যালবার্টের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও একসময় বিস্তর কাটাছেঁড়া হয়। বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে এক মেয়ে হয় তাঁর। দীর্ঘ সময় মেয়ের পিতৃত্ব অস্বীকার করার পর ২০২০ সালে হাত তুলে নেন তিনি। ৫৮ বছর বয়সি ডেলফিন বোয়েলকে কন্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। রাজ পরিবারের স্বীকৃতি আদায় করতে দীর্ঘ আইনি লড়াই লড়তে হয়েছিল ডেলফিনকে। তিনি বর্তমানে রাজ পরিবারের পদবী ব্যবহার করেন।
