সন্দীপ সরকার, কলকাতা: বর্ষসেরার স্বীকৃতি। যা হওয়া উচিত আনন্দের। গর্বের। সারা বছরের পারফরম্যান্সকে পুরস্কৃত করছে রাজ্য সংস্থা, এর চেয়ে গৌরবের মুহূর্ত কারও কাছে হতে পারে নাকি!
অথচ বর্ষসেরা আম্পায়ারের স্বীকৃতিই কাঁটা হয়ে বিঁধছে বঙ্গ ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা সিএবি-কে। এমনিতেই এবার বছরের সেরা আম্পায়ার নির্বাচন নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর সিএবি-র বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। তার আগে সিএবি-র অস্বস্তি বাড়াল ক্ষুব্ধ আম্পায়ারের পত্রবোমা। কম নম্বর পাওয়ায় যিনি সটান অভিযোগপত্র পাঠালেন সিএবি সচিবকে। প্রতিলিপি পাঠালেন সিএবি প্রেসিডেন্ট ও আম্পায়ার্স কমিটির চেয়ারম্যানকেও। প্রশ্ন তুললেন, আম্পায়ারদের নম্বর দেওয়ার নিয়মে স্বচ্ছতা নিয়ে।
প্রেমদীপ চট্টোপাধ্যায়। বোর্ডের প্যানেলে থাকা সিএবি-র গ্রেড ওয়ান আম্পায়ার। শনিবার তিনি চিঠি পাঠিয়েছেন সিএবি সচিব বাবলু কোলেকে (যে চিঠির প্রতিলিপি আছে এবিপি লাইভ বাংলার হাতে)। চিঠির প্রতিলিপি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কেও পাঠিয়েছেন। প্রেমদীপের অভিযোগ, তিনি অসুস্থ ছিলেন বলে গোটা মরশুমে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলিয়েছেন। তাঁর মূল্যায়ন করার সময় ৮৬ শতাংশ নম্বর দেওয়া হয়েছে। তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন প্রেমদীপ। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘আম্পায়ারদের জন্য সিএবি-র যে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ রয়েছে, সেখানে জানানো হয়েছে আমি মাত্র ৮৬ শতাংশ নম্বর পেয়েছি। যা দেখে আমি স্তম্ভিত। আম্পায়ার হিসাবে আমার ২৮ বছরের অভিজ্ঞতা মেনে নিতে পারছে না যে, এই নম্বর আমি পেতে পারি। কারণ যে দুটি ম্যাচ পরিচালনা করেছিলাম, দুটিই ছিল ত্রুটিমুক্ত।’
এরপর প্রেমদীপ লিখেছেন, ‘সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানতে পেরেছি, অন্তত একজন আম্পায়ারের নম্বরের শতাংশ সঠিক হিসেব হয়নি। তাই আমি অনুরোধ করছি, আমার নম্বর ফের যোগ করে দেখা হোক এবং কোন বিভাগে কত নম্বর পেয়েছি সেটা ভেঙে বলা হোক। আমি নিশ্চিত আম্পায়ারদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যে পার্সেন্টেজ টেবিল রয়েছে সেখানে আমার নম্বর ঠিক নেই। আশা করছি দ্রুত জবাব পাব।’
প্রেমদীপ এবিপি লাইভ বাংলাকে বললেন, ‘বাংলা ক্রিকেটের জন্য ২৮ বছর দিয়েছি। অজস্র ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান ম্যাচ, লিগ ফাইনাল, বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলিয়েছি। স্বীকৃতি দেওয়ার মঞ্চে গতবারও উপেক্ষিত ছিলাম। আমার চেয়ে অনেক কম পার্সেন্টেজ থাকা আম্পায়ার সেরার স্বীকৃতি পেয়েছিল। তাছাড়া এবার একজন আম্পায়ারের পার্সেন্টেজ নাকি ভুল হয়েছে। আমার প্রশ্ন, শুধু একজনের জন্যই ভুল হল? তাহলে কি নেপথ্যে অন্য় কিছু আছে? গোটা মূল্যায়ন প্রক্রিয়াতেই তার মানে গলদ থাকতে পারে। সেটারই জবাব চেয়েছি। সদুত্তর না পেলে সিএবি-র ওম্বাডসম্যানকে চিঠি লিখব।’
সিএবি-র বর্ষসেরা আম্পায়ার বাছাই করা নিয়ে এবার যা হচ্ছে, তাকে নাটক বললেও হয়তো কম বলা হয়, বলছে ময়দানের বড় একটা অংশ। বৈঠক করে মোট পাঁচটি বিভাগের জন্য় সেরা আম্পায়ার নির্বাচন করা হয়েছিল। সিএবির একাধিক পদাধিকারী, আম্পায়ার কমিটির প্রধানের উপস্থিতিতে সেই বৈঠকে ঠিক হয়েছিল, যুগ্মভাবে বর্ষসেরা গ্রেড ওয়ান আম্পায়ার হবেন সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায় ও অদীপ্ত মুখোপাধ্যায়। কিন্তু পরে সিএবি-র একাংশের প্রতিবাদে সেই সিদ্ধান্ত বদলে যায়। সুবীর সর্বোচ্চ ৯৩.১০ শতাংশ নম্বর পেলেও সিএবির অপসারিত যুগ্মসচিব মদন ঘোষের প্রতিবাদের পর রিভিউ করে দেখা গিয়েছিল যে, তাঁর নম্বরে গোলযোগ রয়েছে। পরে সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় সিদ্ধান্ত নেন, গ্রেড ওয়ান বিভাগে বর্ষসেরা হবেন অদীপ্ত। বাদ পড়েন সুবীর। আম্পায়ার্স কমিটির সুপারিশ উড়িয়ে কাউকে বর্ষসেরার স্বীকৃতি থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে, সাম্প্রতিককালে এরকম ঘটনা ঘটেনি।
আরও পড়ুন: মাত্র ১৫ বছর বয়সে এই দাপট! সিরাজ়ের এক ওভারে ৪,৬,৪! দলীপ ট্রফির ফাইনালে বৈভবের প্রলয়
সেই বিতর্ক ফের উস্কে দিলেন প্রেমদীপ। তাঁর অভিযোগ নিয়ে প্রথমেই যোগাযোগ করা হয়েছিল আম্পায়ার কমিটির প্রধান প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘বর্ষসেরা আম্পায়ার তো শুধু পার্সেন্টেজ দেখে বিচার হয় না। দেখা হয় তিনি কটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলিয়েছেন, কতগুলি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন, বেঙ্গল প্রো টি-২০ লিগ খেলিয়েছেন কি না, কোনও বিতর্কিত ম্যাচে আম্পায়ারিং করেছেন কি না, সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কি না ইত্যাদি। আর পার্সেন্টেজ দেওয়ায় কোনও ভুল ছিল কি না, সেটা তো সিএবি-র কম্পিউটার ও ডেটা সিস্টেম যাঁরা পরিচালনা করেন, তাঁরা বলতে পারবেন।’
প্রেমদীপের অভিযোগপত্র পেয়েছেন? সিএবি সচিব বাবলু কোলে বললেন, ‘পেয়েছি। উনি তো অসুস্থ ছিলেন বলে ম্যাচই খেলাননি। আর বর্ষসেরা শুধু পার্সেন্টেজের ভিত্তিতে হয় না। অনেক মাপকাঠি রয়েছে।’ সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পার্সেন্টেজ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। পরে রিভিউ করে নম্বর কমে গিয়েছিল। বাবলু কোলে বললেন, ‘ওটা একটা সত্যিকারের ভুল ছিল। সেটা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বলা হয়েছে। শুধরে নেওয়া হয়েছে। তবে সেটা বড় কোনও ব্যাপার নয়। সমস্যা মিটে গিয়েছে।’
