নিউ জার্সি: তিনি প্রয়াত হয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যেরা অন্ত্যেষ্টির পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছিলেন।
সেই স্তোল সুরবাক্কিন (Stale Solbakken) শুধু বেঁচেই যাননি সে যাত্রায়, ফুটবল মাঠেও ফিরেছেন। তাঁর প্রশিক্ষণে নরওয়ে দল বিশ্বকাপে ঝড় তুলেছে। আর্লিং হালান্ডের দুরন্ত ছন্দে ভর করে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছে নরওয়ে। দক্ষ নাবিকের মতো যে দলের হাল ধরে রয়েছেন স্তোল সুরবাক্কিন।
নরওয়ের কোচের জীবন কাহিনি কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম কিছু নয়। তিনি প্রয়াত হয়েছিলেন। সাত মিনিটের জন্য থেমে গিয়েছিল হৃদস্পন্দন। পরিবারের সদস্যেরা শেষকৃত্যের পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছিলেন। যদিও এরপরই ঘটে অলৌকিক কাণ্ড। প্রাণ ফিরে পান স্তোল সুরবাক্কিন।
যে ক্লাবের হয়ে খেলতেন স্তোল সুরবাক্কিন, সেই কোপেনহাগেনের প্র্যাক্টিস চলাকালীন হৃদরোগে আক্রান্ত হন। মাঠেই লুটিয়ে পড়েছিলেন। ২০০১ সালের ১৩ মার্চের ঘটনা। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৩ বছর। ততদিনে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ও ২০০০ সালের ইউরো কাপে খেলা হয়ে গিয়েছে তাঁর। যদিও ক্লাবের হয়ে মাত্র ১৪টি ম্যাচে খেলেছিলেন।
সতীর্থরা ঘাবড়ে গিয়ে দলের চিকিৎসক ফ্র্যাঙ্ক ওডগার্ডকে খবর দেন। ৮ মিনিট পর হাজির হয় অ্যাম্বুলেন্স। পরে ওডগার্ড বলেছিলেন, ‘চিকিৎসার পরিভাষায় ওর মৃত্যু হয়েছিল। ও যে এখনও বেঁচে রয়েছে, সেটা অলৌকিক কাণ্ড। কারণ ওর হৃদস্পন্দন থেমে গিয়েছিল।’
হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল স্তোল সুরবাক্কিনকে। দীর্ঘ ২৬ ঘণ্টা অচৈতন্য ছিলেন। ক্লাবের সদস্যেরা তাঁর বাড়ি গিয়ে স্ত্রী আনিক্কেনকে দুঃসংবাদটি দিয়েছিলেন। তখনই জানা যায় যে, জন্মগতভাবে হার্টের সমস্যা ছিল স্তোল সুরবাক্কিনের।
অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যাওয়ার পর তাঁর বুকে পেসমেকার বসানো হয়। কিন্তু খেলা ছাড়তে বাধ্য হন স্তোল সুরবাক্কিন। সুস্থ হয়ে উঠে তিনি শুরু করেন কোচিং।
এখন সুরবাক্কিনের বয়স ৫৮ বছর। পরে তিনি ঘটনাটি নিয়ে বলেছিলেন, ‘সত্যি নাটকীয় অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তবে আমার পরিবারের কাছে সেটা ছিল দুঃসহ সময়। কারণ, আমি তো কিছু টের পাইনি। মনে হয়েছিল আলো নিভে গিয়েছে। আমার বাবা-মা ডেনমার্কে উড়ে গিয়েছিল। আমাকে পরে বলা হয়েছিল যে, আমার মা অন্ত্যেষ্টির চিন্তাভাবনা শুরু করেছিল। প্রথমে ওরা ভেবেছিল আমি বাঁচব কি না। পরে ওরা দুশ্চিন্তা করতে শুরু করে আমার মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না। এই চিন্তাভাবনাই আমার পরিবার ও সতীর্থদের খুব উৎকণ্ঠায় রেখেছিল। যারা আমাকে লুটিয়ে পড়তে দেখেছিল। কার্যত মৃত্যু দেখেছিল এবং তারপর প্রাণ ফিরে পাওয়াও দেখে। এই ঘটনা অবশ্যই আমার জীবন বদলে দিয়ে যায়। ওই ঘটনার পর আমিও বুঝতে পারি, জীবনে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটা নয়।’
সেই হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পাঁচ বছর পর কোপেনহাগেন ক্লাবেই তিনি ম্যানেজার হিসাবে নিযুক্ত হন। তারপর জার্মানির এফসি কোলনে যোগ দেন।
পরে ফের কোপেনহাগেনের ম্যানেজার হন স্তোল সুরবাক্কিন। ২০১৩ সাল থেকে সাত বছর কাটান। সব মিলিয়ে সাড়ে ১২ বছর কোপেনহাগেনের ম্যানেজার হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে স্তোল সুরবাক্কিন নরওয়ে দলের কোচ হন। যদিও ২০২৪ সালের ইউরো কাপের যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয় নরওয়ে। আর্লিং হালান্ড, মার্টিন ওডগার্ডদের মতো প্রতিভাবান ফুটবলার থাকা সত্ত্বেও। স্তোল সুরবাক্কিন নিজেই জানিয়েছিলেন যে, ২৮ বছরের অপেক্ষা কাটিয়ে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলে তিনি ইস্তফা দিতেন।
কিন্তু ফুটবল ঈশ্বর হয়তো তাঁর জন্য অন্য কোনও পরিকল্পনা করেছিলেন…
